সমবায় সমিতি পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য এর অডিট বা নিরীক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ এবং সমবায় সমিতি বিধিমালা, ২০০৪ অনুযায়ী এই নিরীক্ষা পরিচালিত হয়।
সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠানের অডিট প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
১. নিরীক্ষক নিয়োগ (Appointment of Auditor)
-
কর্তৃত্ব: সমবায় সমিতি আইন অনুযায়ী, সমবায় সমিতিগুলোর নিরীক্ষা করার জন্য সরকার কর্তৃক নিযুক্ত নিবন্ধক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি দায়ী।
-
আউটসোর্সিং: নিবন্ধক চাইলে সমবায় সমিতিগুলোর অডিট করার জন্য উপযুক্ত নিরীক্ষা ফার্ম বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) ফার্মকে নিয়োগ বা ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন।
-
নিয়মিত নিরীক্ষা: প্রতিটি নিবন্ধিত সমবায় সমিতিকে তার আর্থিক বছর শেষে বছরে কমপক্ষে একবার বাধ্যতামূলক নিরীক্ষা করাতে হয়।
২. নিরীক্ষার উদ্দেশ্য (Objectives of Audit)
সমবায় সমিতির নিরীক্ষার প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো:
-
হিসাবপত্রের সত্যতা যাচাই: সমিতির দাখিলকৃত আর্থিক বিবরণী (যেমন—উদ্বৃত্তপত্র, লাভ-ক্ষতির হিসাব, প্রাপ্তি ও প্রদান হিসাব) সঠিক ও আইনানুগভাবে প্রস্তুত হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করা।
-
আইন ও বিধি পরিপালন: সমিতিটি সমবায় সমিতি আইন, ২০০১, সমবায় সমিতি বিধিমালা, ২০০৪ এবং সমিতির নিজস্ব উপ-আইন (Bye-Laws) সঠিকভাবে অনুসরণ করেছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা।
-
আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন: সমিতির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, সম্পদ ও দায়ের অবস্থান এবং ব্যবসার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা।
-
স্বচ্ছতা ও দক্ষতা: সমিতির আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা।
-
বিশেষ মনোযোগ: সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ বা মুনাফা বণ্টনের ক্ষেত্রে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, তা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
৩. নিরীক্ষা প্রক্রিয়া (Audit Procedure)
নিরীক্ষার সময় নিরীক্ষক নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করেন:
-
দলিল ও রেকর্ড পরীক্ষা: সমিতির সকল প্রকার আর্থিক রেকর্ড, ভাউচার, ক্যাশ বই, লেজার, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, চুক্তিপত্র, রেজ্যুলেশন (সিদ্ধান্ত বই) ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়।
-
মজুদ ও সম্পদ যাচাই: সমিতির হাতে থাকা নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালেন্স এবং অন্যান্য সম্পদ (যেমন—স্থাবর সম্পত্তি, মজুদ পণ্য) বাস্তবে উপস্থিত আছে কিনা, তা সরেজমিনে যাচাই করা হয়।
-
সদস্যের হিসাব: সদস্যদের শেয়ার, সঞ্চয়, ঋণ এবং অন্যান্য দেনা-পাওনার হিসাব সঠিকভাবে পরিচালিত হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করা হয়।
-
পরিচালনা পদ্ধতি পর্যালোচনা: সমিতির সাধারণ সভা এবং পরিচালনা পর্ষদের সভাগুলোতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো আর্থিক লেনদেনে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
৪. নিরীক্ষা প্রতিবেদন (Audit Report)
নিরীক্ষা শেষে নিরীক্ষক একটি বিস্তারিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। এই প্রতিবেদনে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে:
-
আর্থিক অবস্থার বিবৃতি: সমিতির হিসাবপত্রের সঠিকতার বিষয়ে নিরীক্ষকের মতামত।
-
অনিয়ম ও ত্রুটি: যদি কোনো আর্থিক অনিয়ম, অসঙ্গতি বা জালিয়াতি ধরা পড়ে, তবে তার বিস্তারিত উল্লেখ।
-
আইন লঙ্ঘনের ঘটনা: সমিতি কর্তৃক সমবায় আইন, বিধি বা উপ-আইনের কোনো ধারা লঙ্ঘন করা হলে, তা চিহ্নিত করা।
-
সুপারিশমালা: সমিতির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিরীক্ষকের সুপারিশমালা।
৫. পরবর্তী পদক্ষেপ
নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল হওয়ার পর:
-
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম থাকলে, সমিতি কর্তৃপক্ষকে তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধন করতে হয়।
-
সংশ্লিষ্ট সমবায় নিবন্ধক বা কর্মকর্তা প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেন এবং প্রয়োজনে সমিতির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারেন বা সমিতির বিলোপ (liquidation) বা বিভাজন (division) প্রস্তাব করতে পারেন।
সংক্ষেপে, সমবায় সমিতির অডিট হলো একটি বাধ্যতামূলক এবং বার্ষিক প্রক্রিয়া যা সমিতির আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আইন পরিপালন নিশ্চিত করে।