সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার পথে আলোকবর্তিকা: প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস | ফাইল ছবি
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস | ফাইল ছবি

‘৫৪তম জাতীয় সমবায় দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার অমিত সম্ভাবনাময় হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, সমবায়ের মূলনীতি, অর্থাৎ সাম্য ও সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত সম্মিলিত প্রচেষ্টা দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে এবং একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সমবায়: আত্মনির্ভরশীলতার মূল চাবিকাঠি

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন, “সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে একটি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।” তাঁর এই মন্তব্য দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সমবায়ের গুরুত্বকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসে। তাঁর মতে, বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, সঞ্চয় ও ঋণদান এবং কুটিরশিল্পের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে সমবায়কে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে তা দেশের অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

প্রফেসর ইউনূস বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সমবায় খাতকে আধুনিক ও গতিশীল করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।” সরকারের এই পদক্ষেপগুলো সমবায় আন্দোলনকে নতুন করে উজ্জীবিত করবে এবং এর সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

‘সাম্য ও সমতায়, দেশ গড়বে সমবায়’

প্রতি বছরের মতো এবারও ১ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে “সাম্য ও সমতায়, দেশ গড়বে সমবায়” এই সময়োপযোগী প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশব্যাপী ‘৫৪তম জাতীয় সমবায় দিবস’ উদ্যাপিত হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা এই উপলক্ষে দেশের সকল সমবায়ী এবং দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই প্রতিপাদ্য সমবায়ের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং এর সামাজিক দায়বদ্ধতাকে প্রতিফলিত করে।

ড. ইউনূস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, যেকোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নে সামাজিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সমবায় সমিতিগুলো এই সামাজিক সম্পৃক্ততা তৈরি ও সংরক্ষণে এক অনায়াস মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সমবায় সমিতিগুলো কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানে তারা বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, যা সমাজের বুনিয়াদকে আরও মজবুত করে।

সমবায়ের বহুমুখী ভূমিকা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে সমবায় আন্দোলনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকার ওপর বিশেষ আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে সমবায় আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। সমবায় এমন একটি প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করে যেখানে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ সম্মিলিতভাবে পুঁজি সংগ্রহ, বাজারজাতকরণ এবং পারস্পরিক সহায়তার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকার যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে চলেছে—একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা—সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে সমবায়ের ভূমিকা অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন। একটি বৈষম্যমুক্ত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সমবায় তার সদস্য ও বৃহত্তর সমাজের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি মডেল তৈরি করতে পারে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমবায়ের প্রভাব

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে, সমবায়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কৃষি সমবায়গুলো কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে সহায়তা করে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমায় এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করে। মৎস্য ও পশুপালন সমবায়গুলো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নত মানের পণ্য বাজারে আনতে সাহায্য করে। একইভাবে, সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায়গুলো গ্রামীণ মানুষের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে, যা তাদের পুঁজি গঠনে এবং ছোট ব্যবসা শুরু করতে সহায়ক হয়।

ড. ইউনূসের এই বার্তা এই ধারণাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করে যে, সমবায় কেবল একটি অর্থনৈতিক মডেল নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি দর্শন। এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তিকে একত্রিত করে এক বৃহত্তর শক্তিতে পরিণত করে, যা সমষ্টিগত সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে।

সকলের প্রতি আহ্বান: সমবায়ের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ

বাণীর শেষাংশে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি এক আন্তরিক আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আসুন, সমবায়ের চেতনাকে ধারণ করে সাম্য ও সমতায় আমরা সকলে মিলে গড়ে তুলি নতুন বাংলাদেশ।” এই আহ্বান ঐক্য, সহযোগিতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি উন্নত জাতি গঠনে সবার অংশগ্রহণের গুরুত্বকে তুলে ধরে।

তিনি ‘৫৪তম জাতীয় সমবায় দিবস, ২০২৫’ উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করেন, যা দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। প্রফেসর ইউনূসের এই বক্তব্য সমবায় আন্দোলনকে জাতীয় অগ্রগতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার এক সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। সমবায়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করে একটি আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের এই স্বপ্ন দেশের লাখো সমবায়ীর মনে নতুন আশা সঞ্চার করেছে।