নিরপেক্ষ না থাকলে পালানোর পথ মিলবে না: প্রশাসনের প্রতি মিয়া গোলাম পরওয়ারে

বক্তব্য রাখছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার | দিগন্ত বাংলা
বক্তব্য রাখছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার | দিগন্ত বাংলা

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার সম্প্রতি খুলনায় এক বিশাল মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার উদ্বোধনকালে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আগামী নির্বাচন যদি ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের মতো হয়, তবে জাতির কপালে চরম দুর্ভোগ নেমে আসবে। শনিবার (১৫ নভেম্বর) সকালে খুলনার জিরো পয়েন্টে অনুষ্ঠিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার এই সমাবেশ থেকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন, যা জনগণের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।


প্রশাসনের প্রতি নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান: 'পালানোর পথ পাবেন না'

মিয়া গোলাম পরওয়ার তার বক্তব্যে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "আপনারা নিরপেক্ষ থাকুন। আগামী নির্বাচন স্বচ্ছ করুন। প্রত্যেক প্রার্থী যেন সমান সুযোগ পেয়ে নির্বাচনী কাজ করতে পারে।"

তিনি অতীতে বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করা কর্মকর্তাদের পরিণতি তুলে ধরে বলেন, "অতীতে যারা কোনো বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করেছে, সেই ওসি-এসপিরা সব পালিয়ে গেছে। তারা এখন ট্রাইব্যুনালে হাজির। প্রধান বিচারপতি পালিয়ে গেছেন। বায়তুল মোকাররমের খতিব পালিয়ে গেছেন। ডিআইজি পালিয়ে গেছেন। পুলিশ কমিশনার পালিয়ে গেছেন। ওসিরা চাকরি ছেড়ে বর্ডার দিয়ে ইন্ডিয়া চলে গেছেন। আপনাদের বিরুদ্ধেও যদি সেই অভিযোগ আসে, আপনারা কিন্তু পালানোর পথ পাবেন না।" এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে আইনানুগ ও নিরপেক্ষ থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।


কালো টাকার প্রভাবমুক্ত নির্বাচন ও দাঁড়িপাল্লার শপথ

জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা নির্বাচনকে 'কালো টাকার প্রভাবমুক্ত' রাখার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, জনগণ ইতোমধ্যেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। তার ভাষায়, "যারা অতীতে ঘের দখল করেছে, মন্দির ভেঙেছে— এবার জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দিয়ে শান্তিতে থাকার জন্য দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেয়ার শপথ করেছে।"

তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে 'কর্তৃত্বববাদী সরকারের কালো যুগ' হিসেবে আখ্যায়িত করে এক 'নতুন বাংলাদেশের' পথে যাত্রার ঘোষণা দেন। অতীতে বিভিন্ন দল ও প্রতীকের (নৌকা, লাঙ্গল, ধানের শীষ) শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সংকট সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, "সুতরাং মানব রচিত বিধান দিয়ে দেশ পরিচালিত হলে দেশে শান্তি আসতে পারে না এটি প্রমাণিত।" তাই তিনি জনগণের প্রতি 'কুরআনের রাষ্ট্র' গড়ার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।


জনসমুদ্র শোভাযাত্রা: ডুমুরিয়া-ফুলতলা দাঁড়িপাল্লার স্লোগানে প্রকম্পিত

মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে এক বিশাল মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। শোভাযাত্রাটি খুলনার জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে গুটুদিয়া, ডুমুরিয়া, খর্ণিয়া, চুকনগর, আঠারোমাইল, রুদাঘরা, রঘুনাথপুর, শাহপুর, ধামালিয়া, জামিরা, ফুলতলা, দামোদর হয়ে শিরোমনি শহীদ মিনার চত্বরে গিয়ে সংক্ষিপ্ত পথসভার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

এই শোভাযাত্রায় পাঁচ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল নিয়ে সাধারণ জনগণ অংশগ্রহণ করেন। উৎসবমুখর পরিবেশে গোটা ডুমুরিয়া ও ফুলতলাসহ খুলনা জেলা 'দাঁড়িপাল্লার' স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। নেতাকর্মীদের মাঝে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। রাস্তার দু'ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাসীরা এ সময় মিয়া গোলাম পরওয়ারকে 'উন্নয়নের কারিগর' বলে স্লোগান দেন। জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার জাতীয় পতাকা নিয়ে হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছা জানান।


সুশাসন ও শান্তির জন্য পরিবর্তন: ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব

সাবেক এই এমপি তার দীর্ঘদিনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা আসার অভিযোগ করে বলেন, "দীর্ঘ বছরের পর বছর ধরে আমাকে স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম করতে দেয়া হয়নি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম করতে পারছি, আলহামদুলল্লিাহ।"

তিনি জনগণের কাছে সুশাসন ও শান্তির জন্য পরিবর্তন, উন্নত ও আধুনিক খুলনা গড়ে তোলার বার্তা পৌঁছে দিতেই এই শোভাযাত্রার আয়োজন বলে জানান। তিনি অঙ্গীকার করেন, "সুখে-দুঃখে মানুষের কল্যাণে আমরা সবসময় আছি এবং দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে এ ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।"

মিয়া গোলাম পরওয়ার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে বাংলাদেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায় এবং তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বসবাসযোগ্য শান্তির বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দেবে। তিনি বলেন, "ইতোমধ্যে নতুন প্রজন্ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবর্তন এনেছে। তারা ৫৪ বছরের শাসনের দেশকে বদলে দিয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় জাতি আগামী নির্বাচনেও দেশে একটি পরিবর্তন আনবে, ইনশাআল্লাহ।" তিনি সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার মাধ্যমে আগামীর দেশকে পরিবর্তনের আহ্বান জানান।


খুলনার জিরো পয়েন্টের পথসভায় সভাপতিত্ব করেন হরিণটানা থানা আমির জি এম আব্দুল গফুর। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন খুলনা-১ আসনের (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা শেখ মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম, অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, গাউসুল আযম হাদী, শেখ সিরাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, মোস্তফা আল মুজাহিদ, আশরাফুল আলম, খুলনা জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ ফকির ও সেক্রেটারি ইলিয়াস হোসাইনসহ স্থানীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।