জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট: প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে এক ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আদেশ জারি করা হয়েছে। এই আদেশটি 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫' নামে পরিচিত, যা দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চলেছে। দেশের জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই আদেশটি এমন সময়ে এসেছে যখন জাতি একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো এবং উন্নত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। এটি কেবল নির্বাচনকালীন প্রক্রিয়াকেই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক সংস্কারকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথকে প্রভাবিত করবে।


আদেশের মূল প্রতিপাদ্য ও লক্ষ্যসমূহ

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর মূল লক্ষ্য হলো জনগণের সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখা এবং সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেট গ্রহণ করা।

আদেশের অনুচ্ছেদ ৩ অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছে যে, "জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশে এই আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হইবে।" এর মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে।

আদেশের অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, এই গণভোটটি অনুষ্ঠিত হবে "এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন"। অর্থাৎ, ভোটাররা একই দিনে নতুন সরকার নির্বাচনের পাশাপাশি দেশের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামোর বিষয়ে তাদের রায় দেবেন। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।


গণভোটের প্রশ্ন ও সংস্কারের প্রস্তাবসমূহ

গণভোটের ব্যালটে জনগণের সামনে একটি একক এবং সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে। আদেশের অনুচ্ছেদ ৪-এ এই প্রশ্নটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে:

‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ (হ্যাঁ/ না)

এই প্রশ্নের অধীনে যে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো জনগণের সম্মতির জন্য চাওয়া হয়েছে, সেগুলো দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। এর মধ্যে রয়েছে:

ক. নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান: প্রস্তাবে বলা হয়েছে, "নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।" এটি একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘদিনের দাবিকে সাড়া দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার পথ সুগম করবে।

খ. দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ গঠন: এই সংস্কারের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো "আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট।" প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চ কক্ষ গঠিত হইবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, সংবিধান সংশোধনী কার্যকর করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে। এটি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য আনবে এবং ক্ষমতাকে এককেন্দ্রিক হওয়া থেকে রক্ষা করবে।

গ. সুনির্দিষ্ট ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও বাধ্যবাধকতা: আদেশে আরও বলা হয়েছে যে, "সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকিবে।" এই বাধ্যবাধকতা সংস্কার প্রক্রিয়াকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনি রূপ দিয়েছে।

ঘ. অপরাপর সংস্কারের বাস্তবায়ন: চূড়ান্তভাবে, আদেশে বলা হয়েছে, "জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।" এটি নিশ্চিত করবে যে সনদের বাকি অংশগুলোও সময়মতো কার্যকর করা হয়।


গণভোট প্রক্রিয়া ও আইনি প্রস্তুতি

আদেশের ৪ (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে, গণভোটের প্রক্রিয়া হবে গোপন ব্যালটে: "ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হইবে এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ব্যালটে প্রত্যেক ভোটার গোপনে ভোটদান করিবেন।"

এই বিশাল আয়োজন সফল করার লক্ষ্যে আদেশের অনুচ্ছেদ ৬ এ আইনি প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে: "গণভোট আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যথোপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা হবে।" এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে এই ঐতিহাসিক গণভোট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও আইনসম্মত হয়।


সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও ম্যান্ডেট

এই গণভোটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফলটি নির্ভর করছে 'হ্যাঁ' অথবা 'না' ভোটের ওপর। আদেশের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী, যদি গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট 'হ্যাঁ' সূচক হয়, তবে সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য একটি বিশেষ পরিষদ গঠিত হবে:

ক. সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন: "এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যাহা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।"

খ. দ্বৈত দায়িত্ব: "ওই নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসাবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন।" অর্থাৎ, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই এই ঐতিহাসিক সংস্কারের কারিগর হবেন।

গ. সংস্কার সম্পন্ন করার সময়সীমা: এই পরিষদকে একটি কঠোর সময়সীমার মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। অনুচ্ছেদ ৭ (গ)-এ বলা হয়েছে, "পরিষদ উহার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।" এই সময়সীমা নিশ্চিত করবে যে সংস্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতায় না পড়ে দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়।


তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠানের এই সিদ্ধান্ত দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের ক্ষমতায়নকে এক নতুন স্তরে উন্নীত করবে। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেটের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। এই গণভোট সফল হলে, বাংলাদেশ তার শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে, যা দেশের স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের জনগণ এখন এই ঐতিহাসিক দিনে তাদের মূল্যবান রায় দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।


জনগণের রায়: এই গণভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক রূপরেখা।